নিজস্ব সংবাদদাতা, বলাগড়, হুগলী : হুগলির বলাগড় ব্লকের ঐতিহ্যবাহী জনপদ জিরাট আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর পৈতৃক ভিটেকে কেন্দ্র করে একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা ঘিরে এলাকায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও তুলে ধরার পাশাপাশি এই উদ্যোগ জিরাট তথা বলাগড়ের পর্যটন, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁর বংশধরেরা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। সম্প্রতি রাজ্য বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে, জিরাটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে এলাকায় ১২৫ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি নির্মাণ করা হবে।
পাশাপাশি তাঁর পুরনো বাড়ির সংস্কার, একটি আধুনিক গ্রন্থাগার, পার্ক এবং স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। সরকারের এই ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।মঙ্গলবার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণদিবসে জিরাটে তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করেন পরিবারের সদস্যরা। পরে তাঁরা জানান, স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তি এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদের অবদান দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বর্তমান উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁর জীবন, আদর্শ ও কর্মের পাশাপাশি মুখোপাধ্যায় পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, জিরাটের বর্তমান আশুতোষ স্মৃতিমন্দির এলাকার কাছেই ছিল মুখোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাসভবন। পরবর্তীকালে সেই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয় আশুতোষ স্মৃতিমন্দির বালিকা বিদ্যালয়। পরে শ্যামাপ্রসাদের ছোট ভাই বামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পাশেই নতুন বাড়ি নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের মতে, আধুনিক জিরাটের বিকাশে বামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশেষ করে অসম লিঙ্ক রোড নির্মাণে তাঁর ভূমিকার কথাও এখনও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ১৯৫২ সালে ভাইপো জনতোষ মুখোপাধ্যায়ের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে শেষবারের মতো জিরাটে এসেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেই সফরের নানা স্মৃতি এখনও পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।বর্তমানে পরিবারের পুরনো বাড়িটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাড়ির একটি অংশে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে বহু পুরনো আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মৃতিচিহ্ন, যা মুখোপাধ্যায় পরিবারের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে।পরিবারের এক সদস্য জানান, কর্মসূত্রে তিনি ২০১৮ সাল থেকে শ্যামনগরে বসবাস করছেন এবং মাঝেমধ্যে জিরাটে আসেন। তাঁর বাবা জনতোষ মুখোপাধ্যায় দুই বছর আগে এই বাড়িতেই প্রয়াত হন। বাড়ি পরিষ্কারের জন্য আগে একজন কর্মী থাকলেও গত বছর চুরির ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িটি এখন তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পরিবারের সদস্যরা বলেন, বহু আগেই এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। এখন যদি ঘোষিত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হয়, তবে জিরাট শুধু শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবেই নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। তাঁদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, পরিবহণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, তাঁরা শুনেছেন বলাগড় এলাকায় বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি শ্যামাপ্রসাদের নামে স্মৃতিসৌধ, গ্রন্থাগার ও পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জিরাট ও বলাগড়ের সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে বলে তাঁদের আশা।

