নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি :আর কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। আর ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে পশ্চিমবাংলায় আগামী পাঁচ বছর কারা সরকার চালাবে। আর এই কয়েক ঘন্টা চিকিৎসা বিজ্ঞানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মরনাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে। এখন হচ্ছে সংকটের সময়। এই সংকটের সময় যখন আমরা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পেরিয়ে ২রা মে সত্যজিৎ রায়ের ১০৫ তম জন্মদিবস পালন করছি তখন আমাদের ফিরে দেখতে হয় সত্যজিতের সৃষ্টিকে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে কী হচ্ছে? দেশের রাজধানীর অনতিদূরে নয়ডাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল জনপথ। বিকশিত ভারতের সমান্তরালে অধিকারহীন শ্রমশক্তির জেগে ওঠার সাক্ষী থাকছে দেশ। সরকারি গণমাধ্যম তথা বৃহৎ পুঁজি পুষ্ট সংবাদ মাধ্যমে সেই আন্দোলনে খবর নেই বললেই চলে। এমন এক পরিস্থিতিতে এই মে মাসের ২ তারিখ ফিরে দেখতে ইচ্ছে করছে প্রায় ৪৬ বছর আগে তোলা সত্যজিৎ রায়ের একটি ছবি। রাজার ভরসা পূর্তি উপলক্ষে বাইরের দেশ থেকে আগত অতিথি-অব্যাগতদের চোখের সামনে থেকে যাবতীয় দারিদ্রকে লুকিয়ে ফেলার যে তোরজোড় রাজার আদেশে শুরু হয়েছিল আর যাবতীয় বিরোধাভাসকে মগজ ধোলাইয়ে ধৌত করার যে প্রক্রিয়া বিজ্ঞানী শুরু করেছিল তার একদম ফটোকপি আমাদের এখনকার দেশ নয় কি! শ্রমিক-কৃষকের যাবতীয় অধিকার ছিন্ন করে, শিল্পীর প্রতিবাদী ভূমিকাকে খর্ব করে রাজা অগ্রসর হয়েছিল নিজের মূর্তি স্থাপনের লক্ষ্যে। এ রাজা উলঙ্গ রাজা। রাজার নির্মাণে সত্যজিতের কাছে ছিল হিটলার বা মুসোলিনীর মডেল। কিন্তু পরিচালক জানতেন না তাঁর ছবির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করবে তাঁরই দেশের একদল শাসক যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে জিতে এসেও মগজ ধোলাই করতে শুরু করবে আর যাবতীয় বিরোধী কণ্ঠস্বরকে গুঁড়িয়ে ফেলবে বুলডোজারের তলায়। সত্যজিৎ জানতেন ফ্যাসিবাদ কাকে বলে, তার কী স্বরূপ, তাই অমন ব্যাঙ্গের ছলে তিনি দেখিয়েছিলেন ভারতীয় ফ্যাসিবাদের সম্ভাব্য রূপ। তিনি সতর্ক করেছিলেন। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন এমন একদিন আসবে, ভারতবর্ষেই এমন একদিন আসবে। কিন্তু তিনি তার থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছিলেন। তার সেই পথে ছিল রূপকথার ছোঁয়া, ছিল কিছু অমোঘ বিশ্বাসের মায়াজাল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে রাজা শ্রমিক-কৃষক সকলের মগজ ধোলাই করতে পারলেও শিক্ষক ও গায়ককে কাবু করতে পারেননি। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন রূপকথার জাদুর ছোঁয়ায় সেই রাজাও বদলে যাবে। হএখানে ব্যক্তির চেয়ে বড় তার চিন্তা, তার আদর্শ। রাজা এখানে প্রতীক, ঠিক যেমন ভাবে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন নাটকে রাজা ক্ষমতা ও অহমিকার প্রতীক । সত্যজিৎ মধ্যবিত্ত পরিসরে থেকে তিনি সরাসরি বিপ্লবের পক্ষ অবলম্বন করতে পারেননি। তিনি রোগটা ধরেছিলেন এবং রোগ যাতে না হয় তার কিছু পথও বাতলে ছিলেন। সত্যজিৎ হয়তো যেটা বুঝতে পারেননি তা হল আগামীর ভারতীয় ফ্যাসিবাদী শক্তি ওই শিক্ষক এবং শিল্পীদেরই তাদের লক্ষ্যবস্তু করবে। তারা বুঝতে পেরে যাবে যে শিক্ষক ও শিল্পীদের মগজ ধোলাই করতে পারলেই সমগ্র জাতির মগজ ধোলাই সম্ভব। কিন্তু সবাই তো আর যন্ত্র নয়। প্রাণ আছে মানুষের। তাই বিরুদ্ধতার আর প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর উঠে আসে সেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে থেকেই। হাজার চেষ্টা করেও তাঁদের মগজ ধোলাই করা যায় না। মুক্তির মাঠের দিকে যে দৌড় সে দৌড় আবার শুরু হয়েছে। রাজাকে গদি থেকে নামানোর জন্য আজ সকলে বদ্ধপরিকর । ক্ষমতার ফানুস চুপসে দিতে ভারতের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক বিক্ষোভের আগুন। সবাই একযোগে বলে উঠুক, দড়ি ধরে মারো টান রাজা হবে খানখান।

