নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি : অভাবের কাছে হার মানেননি তিনি। পায়ে নেই দামি রানিং শু, শরীরে নেই আধুনিক প্রশিক্ষণের সব সুযোগ-সুবিধা। সংসারে নিত্যদিনের টানাপোড়েন, কখনও পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা , সবকিছুকে সঙ্গী করেই ট্র্যাকে ছুটেছেন হুগলীর বলাগড়ের মিলনগড়ের মেয়ে শর্মিলা মণ্ডল। আর সেই অদম্য লড়াইয়ের পুরস্কার হিসেবে ৭৪তম রাজ্য অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব ২৩ মেয়েদের বিভাগে ১৫০০ ও ৫০০০ মিটার দুই ইভেন্টেই ব্রোঞ্জ পদক জিতে জেলার মুখ উজ্জ্বল করলেন তিনি। গত ৯ থেকে ১২ জুলাই সল্টলেকের সাই স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আয়োজিত রাজ্য অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫০০ মিটার ফাইনালে ৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ৪ মিনিট ৫১ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে তৃতীয় হন শর্মিলা। এরপর ৫০০০ মিটারেও ৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৯ মিনিট ২৭ সেকেন্ড সময়ে ফিনিশ লাইন ছুঁয়ে আবারও জিতে নেন ব্রোঞ্জ পদক। এক আসরে জোড়া পদক জিতে তিনি রাজ্যের ক্রীড়ামহলের নজর কেড়েছেন। তবে এই সাফল্যের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে জিরাটের বীণাপানি স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে কোচ অর্জুন সরকারের কাছে অ্যাথলেটিক্সে হাতেখড়ি। পরে বলাগড়ের শ্রীপুর মাঠে কোচ তরুণ কান্তি ঘোষের কাছে অনুশীলন করেন। বর্তমানে কলকাতার সরোবর অ্যাথলেটিক সেন্টারে কোচ সুভাষ সরকারের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করছেন তিনি।কোচ সুভাষ সরকারের কথায়, “শর্মিলার মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। ও শুধু আমাদের নয়, গোটা জেলার গর্ব। সঠিক সুযোগ ও সহায়তা পেলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও সাফল্য এনে দিতে পারবে।” কিন্তু ট্র্যাকের লড়াইয়ের থেকেও কঠিন লড়াই তাঁকে লড়তে হচ্ছে জীবনের সঙ্গে। পূর্ব বর্ধমানের কালনা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন শর্মিলা। পরিবারের দায়িত্ব আর স্বপ্ন দুইয়ের টানা পোড়েনের মাঝেও তিনি অনুশীলন বন্ধ করেননি। শর্মিলার বাবা পরিতোষ মণ্ডল অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষ করে সংসার চালান। মা শিপ্রা মণ্ডল গৃহবধূ। ভাই প্রকাশ বলাগড় বিজয়কৃষ্ণ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সীমিত আয়ের সংসারে মেয়ের প্রশিক্ষণ, পুষ্টিকর খাবার কিংবা প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জামের খরচ জোগানো প্রায় অসম্ভব। বাবা পরিতোষ মণ্ডলের কণ্ঠে ফুটে ওঠে অসহায়তার সুর , “মেয়েকে ভালো মানের জুতো কিনে দিতে পারি না। যে জুতোর দরকার, তার দাম ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ও মাত্র হাজার-বারোশো টাকার জুতো পরে অনুশীলন করে। ভালো খাবারও দিতে পারি না। তবু ও হাল ছাড়ে না। চাই, মেয়ে একদিন দেশের নাম উজ্জ্বল করুক।” মা শিপ্রা মণ্ডলের আশা, “সরকারি সাহায্য পেলে মেয়ে আরও ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবে। ও যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, এটাই আমাদের একমাত্র স্বপ্ন।” শর্মিলার সাফল্যের ধারাবাহিকতা নতুন নয়। ২০২৪ সালে জেলাস্তরের প্রতিযোগিতায় ৫০০০ মিটারে সোনার পদক জিতেছিলেন তিনি। ২০২৫ সালে রাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিযোগিতায় রুপোর পদক অর্জন করেন। আর এবার রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপে জোড়া ব্রোঞ্জ জিতে নিজের প্রতিভার আরও একবার প্রমাণ দিলেন।নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে শর্মিলা বলেন, “আমি আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের হয়ে খেলতে চাই। ভারতের জার্সি গায়ে চাপানোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।” অভাবের সংসার, অসমাপ্ত পড়াশোনা, সস্তার জুতো আর সীমাহীন সংগ্রাম , এসবই আজ শর্মিলার জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে হার মানিয়ে তাঁর চোখে একটাই লক্ষ্য ,দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৌড়ানো। হয়তো আজ তাঁর পায়ে দামি জুতো নেই, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির জোরেই তিনি ছুটছেন সাফল্যের দিকে। শর্মিলা মণ্ডলের এই লড়াই শুধু দুটি ব্রোঞ্জ পদকের গল্প নয়, এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার এক অনন্য অনুপ্রেরণার কাহিনি।

