পশ্চিমবঙ্গে মে দিবস: প্রাসঙ্গিকতার লড়াই নাকি প্রতীকী উদযাপন

জিরো নিউজ ব্ল্যাক নিউজ হট টক হট নিউজ

নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি: আজ International Workers’ Day বা মে দিবস। শ্রমিক অধিকারের দাবিতে বিশ্বজুড়ে পালিত এই দিন পশ্চিমবঙ্গেও যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়। শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য অটুট, তবে বদলে যাওয়া অর্থনীতিতে প্রশ্ন বাস্তব লড়াই কতটা দৃশ্যমান? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে- এই দিন কি এখনও আগের মতোই প্রাসঙ্গিক, নাকি তা ধীরে ধীরে প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? মে দিবসের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর সূত্রপাত Haymarket Affair-এর ঘটনায়, যেখানে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের দাবিকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন গড়ে ওঠে। শিল্প বিপ্লবের সময় শ্রমিকদের দিনে ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো, ছিল না নির্দিষ্ট মজুরি বা নিরাপত্তা। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় শিকাগোর ‘হে মার্কেট’ আন্দোলনে। এই আন্দোলনের স্মৃতিতেই ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।সেই ঐতিহ্য বহন করেই আজও বিশ্বজুড়ে এই দিনটি শ্রমিক সংহতির প্রতীক।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে, মে দিবসের গুরুত্ব আলাদা করে চোখে পড়ে। জুট মিল, চা বাগান, বন্দর ও রেল – এই সব ক্ষেত্রেই শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাব স্পষ্ট। ফলে প্রতি বছর মে দিবসে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল মিছিল, সভা ও কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরে।
তবে বাস্তব চিত্রে এসেছে পরিবর্তন। শিল্পক্ষেত্রের সংকোচন এবং পরিষেবা খাতের প্রসারের ফলে শ্রমিক শ্রেণির গঠন বদলেছে। অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কাজের সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মে দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে ততটা সচেতন নয় – তাদের কাছে এটি অনেক সময় শুধুই একটি সরকারি ছুটির দিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট, কারণ শ্রমিকদের মৌলিক সমস্যা‌ – ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা – এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বরং গিগ ইকোনমি ও অস্থায়ী চাকরির যুগে এই সমস্যাগুলি নতুন রূপে সামনে আসছে।
তবে একই সঙ্গে এই দিনটির উদযাপন অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বড় বড় মিছিল ও বক্তৃতার বাইরে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে মে দিবস এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি একদিকে এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা অটুট, অন্যদিকে বাস্তব প্রয়োগে তা অনেকাংশেই প্রতীকী হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস শুধুমাত্র উদযাপনের দিন নয়, বরং শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যাকে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় – উন্নয়নের চাকা ঘোরে শ্রমিকের ঘামে। তাই তাদের অধিকার সুরক্ষিত করাই প্রকৃত অগ্রগতির চাবিকাঠি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *